শনিবার, ২৮ মার্চ, ২০১৫

মধ্যযুগীয় মুসলিম মনীষীদের নাম বিকৃতি

মধ্যযুগীয় মুসলিম চিন্তাবিদরা বিশ্বের মানুষের জন্য আলোকবর্তিকাস্বরূপ। তারা আলোকিত করেছেন আমাদের চিন্তাচেতনাকে, সভ্যতা-সংস্কৃতিকে, জীবন-জগৎকে। দুঃখজনক হলেও সত্য, পাশ্চাত্যের অনেক গবেষক এসব মুসলিম মনীষীর নামকে উপস্থাপন করেছেন বিকৃতভাবে। ফলে প্রাচ্যের লোকগুলো তাদের চিরচেনা এসব মনীষীকে পাশ্চাত্যের দেয়া নামে চিনতেও পারেন না। প্রথমেই ধরা যাক মোহাম্মদ ইবনে মুসা আল-খারিজমীর কথা। তিনি ছিলেন মুসলমান বিজ্ঞানীদের শ্রেষ্ঠতম একজন। তার সিদ্ধান্তগুলো মধ্যযুগীয় গণিত শাস্ত্রকে আছন্ন করে রেখেছিল। তিনি ছিলেন একাধারে ভূগোলবিদ, জ্যোতির্বিদ, গণিতবিদ ও দার্শনিক। তার সিদ্ধান্তগুলো পরে আধুনিক ইউরোপ অকুণ্ঠচিত্তে গ্রহণ করেছে। ইউরোপীয়রা বিশেষত ল্যাটিন লেখকরা তার নামকে বিকৃতি করে লিখছে গরিটাস বা আল গারদম।

রসায়ন বিজ্ঞানী জাবির ইবনে হাইয়ানের কথা আমরা অবগত। কেবল চিকিৎসা বিষয়েই জাবির প্রায় ৫০০ গ্রন্থ রচনা করেন। তাকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ রসায়নবিদদের একজন হিসেবে গণ্য করা হয়। আরবি ভাষায় জারিব শব্দের অর্থ যিনি সংস্কার সাধন করেন, শৃংখলা বিধান করেন। অথচ তার নামটি বিকৃত করে পাশ্চাত্য ইতিহাসবিদরা লিখেছেন ‘জিবার’।

ইয়াকুব ইবনে ইসহাক আল কিন্দি কোরআন, হাদিস, ফিকাহ, ইতিহাস, দর্শন, ভাষাতত্ত্ব, রাজনীতি, অংকশাস্ত্র, জ্যোতির্বিদ্যা প্রভৃতি নানা বিষয়ে বিশারদ ছিলেন। তিনি ছিলেন গ্রিক, হিব্রু, ইরানি, সিরিয়াক এমনকি আরবি ভাষাতেও বুৎপত্তিসম্পন্ন। তিনি নানা বিষয়ে ২৬৫ খানা গ্রন্থ রচনা করেন। পাশ্চাত্য ইতিহাসবিদরা তার নাম বিকৃত করে তাকে পরিচিত করেছেন ‘কিন্ডাস’ নামে। তেমনি জ্যোতির্বিদ আবুল মাসারের নাম পরিবর্তন করে তাকে চিহ্নিত করা হয়েছে মাসের নামে। কাগজের অন্যতম আবিষ্কারক ইউসুফ ইবনে ওমরের নাম ইংরেজি স্টাইলে রাখা হয়েছে ‘উমট’।
আবদুল্লাহ আল বাত্তানী ছিলেন একজন মশহুর জ্যোতির্বিদ এবং গণিতজ্ঞ। তিনি নিজস্ব মানমন্দির প্রতিষ্ঠা করেন জ্যোতির্বিদ্যা চর্চার জন্য। তিনি বহু বছর ধরে জ্যোতির্বিদ্যায় প্রচলিত ভুলগুলো সংশোধন করে এই শাখার অনেক সংস্কার ও উন্নতিসাধন করেন। অথচ পাশ্চাত্য ইতিহাসবিদরা তাকে উল্লেখ করেছেন আল ‘বাতেজনিয়াজ’ বা আল বিটেনিয়াজ বলে।

চিকিৎসা বিজ্ঞানী আল রাজির নাম কে না জানে। তিনি প্রায় দুশ’র মতো গ্রন্থ রচনা করেন, যার শ’খানেক চিকিৎসা শাস্ত্রের ওপর। তবে তার সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব হচ্ছে ‘আল জুদায়ী ওয়াল হাসবাহ’ নামক গ্রন্থটি। ইংরেজি ভাষাতেই ১৪৯৮ থেকে ১৮৬৬ সাল পর্যন্ত এই গ্রন্থখানা মোট চল্লিশবার মুদ্রিত ও প্রকাশিত হয়েছে। তিনি কিতাব আল মনসুরী নামে দশ খণ্ডে একটি বিরাট চিকিৎসা গ্রন্থও প্রণয়ন করেন। এই মহান চিকিৎসা বিজ্ঞানীর নতুন নামকরণ করা হয়েছে ‘রাজাম’।
জ্যোতির্বিজ্ঞানী আল জারকালীর নাম পাশ্চাত্য গ্রন্থসমূহে উল্লিখিত হয়েছে ‘মারজাকেল’ নামে।

চিকিৎসা বিজ্ঞানের জনক বলা হয় ইবনে সিনাকে। তার প্রকৃত নাম আবু আলী আল হুসাইন। তার উপাধি হচ্ছে আল শেখ আল রইস। অথচ তার নামও বিকৃতির হাত থেকে রেহাই পায়নি। পাশ্চাত্য ইতিহাসবিদরা তার নাম দিয়েছেন জালিনুস। কেবল তাই নয়, মুসলিম ঐতিহাসিক স্থানসমূহ জাবালুত তারেক হয়েছে বিজ লিটার, দারুসসালাম হয়েছে জেরুসালেম, মিসরীয় শহর ইস্কান্দরিয়া হয়েছে আলেকজান্দ্রিয়া বা অ্যালেক্স, বায়তুল্লাহাম হয়েছে বেথেলহাম।

আজকাল আমাদের দেশেও মুসলমানদের নাম নিয়ে শুরু হয়েছে নানা রকম বিদ্রূপ। টিভির একটি বিজ্ঞাপনে ইউনুস নামের একজন লোককে দেখানো হয়, যে কিনা নিজের আঙুলগুলোও ভালো করে গুনতে পারে না। অথচ আমাদের একজন নোবেল বিজয়ীর নাম ইউনূস। সর্বোপরি ইউনুস একজন নবীর নামও বটে। আমাদের একজন প্রথিতযশা কথাসাহিত্যিক তার একটি টিভি নাটকে ‘মফিজ’ নামের এক পাগলকে উপস্থাপনা করলেন। অথচ মফিজ কতইনা পবিত্র একটি নাম। তেমনি তিনি ‘কুদ্দুস’ নামটিকেও তার মতো করে এদেশের অগণিত নাদানের মুখে তুলে দিয়েছেন। অথচ ‘কুদ্দুস’ আল্লাহর নাম।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন